BREAKING
সর্বশেষ গুরুত্বপূর্ণ খবর জানতে আমাদের সঙ্গে থাকুন

যাদবপুরে ভাঙচুর: ছাত্র রাজনীতি কোথায়, আর বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ন্ত্রণই বা কোথায়?

যাদবপুরে ভাঙচুর: ছাত্র রাজনীতি কোথায়, আর বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ন্ত্রণই বা কোথায়?
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় বরাবরই শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়, বাংলার ছাত্র-রাজনীতি ও মতাদর্শগত বিতর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। কিন্তু সেই ক্যাম্পাসেই যখন রাজনৈতিক মতবিরোধ গড়ায় সংঘর্ষ, ভাঙচুর এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতীকের ক্ষতির ঘটনায়, তখন প্রশ্ন ওঠে—ছাত্র রাজনীতি কি গণতান্ত্রিক মতপ্রকাশের জায়গায় থাকছে, নাকি ধীরে ধীরে দখল করে নিচ্ছে সংঘাতের রাজনীতি? সাম্প্রতিক ঘটনায় ABVP এবং বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলির মধ্যে সংঘর্ষকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষই পরস্পরের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছে। কে প্রথম হামলা চালিয়েছে, কারা বহিরাগতদের নিয়ে এসেছে, কিংবা ঠিক কোন পর্যায়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেল—এসব প্রশ্নের নিরপেক্ষ তদন্ত এখনও জরুরি। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও ঘটনার তদন্তে কমিটি গঠনের কথা জানিয়েছে। তবে অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের বাইরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিতরে মতবিরোধের সমাধান কীভাবে হবে। কোনও ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে অন্য সংগঠনের রাজনৈতিক বা সাংগঠনিক বিরোধ থাকতেই পারে। কিন্তু সেই বিরোধ যদি ইট-পাথর, আগুন, মারামারি কিংবা সম্পত্তি ভাঙচুরে পৌঁছে যায়, তাহলে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের উপর। শিক্ষা ও গবেষণার পরিবেশও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আরও তাৎপর্যপূর্ণ হল, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতীকও এই ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে রিপোর্ট এসেছে। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতীক শুধুমাত্র কাঠ বা পাথরের তৈরি কোনও কাঠামো নয়; তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে প্রতিষ্ঠানের ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং হাজার হাজার ছাত্রছাত্রীর আবেগ। তাই রাজনৈতিক সংঘর্ষে সেই প্রতীক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া আসলে ক্যাম্পাসের সামগ্রিক পরিবেশের অবনতিরই প্রতীকী ছবি। এই ঘটনার আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল ‘বহিরাগত’ বিতর্ক। দুই পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে বহিরাগতদের ক্যাম্পাসে আনার অভিযোগ তুলেছে। যদি সত্যিই বাইরের রাজনৈতিক কর্মীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিতরে ঢুকে ছাত্র রাজনীতির সংঘাতে যুক্ত হয়ে থাকেন, তাহলে সেটি শুধু আইনশৃঙ্খলার প্রশ্ন নয়—বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে। যাদবপুরের ঐতিহ্য হল প্রশ্ন করা, বিতর্ক করা এবং ভিন্ন মতকে সামনে আনা। সেই ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব ছাত্র সংগঠন, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এবং রাজনৈতিক দল—সবার। কারণ রাজনৈতিক মতাদর্শের লড়াই গণতন্ত্রের অংশ হতে পারে, কিন্তু হিংসা ও ভাঙচুর কোনওভাবেই গণতান্ত্রিক রাজনীতির বিকল্প হতে পারে না। এখন তাই সবচেয়ে প্রয়োজন দোষারোপের রাজনীতি নয়, দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত। কারা হামলা চালিয়েছে, কারা ভাঙচুর করেছে, বহিরাগত কেউ যুক্ত ছিল কি না—প্রমাণের ভিত্তিতে তা সামনে আসা দরকার। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকেও স্পষ্ট করতে হবে, ক্যাম্পাসে নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে তাদের ভূমিকা কতটা কার্যকর। শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন একটাই—যাদবপুরে রাজনীতি থাকবে, অবশ্যই থাকবে। কিন্তু সেই রাজনীতি কি যুক্তির লড়াই হবে, নাকি শক্তির প্রদর্শন? এই ঘটনার পর যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা সম্ভবত সেটাই।